রং বরষে ভিগে চুনারওয়ালী : দোল যাত্রার ইতিকথা


holi
উদাস করা দুপুর আর প্রহর শেষের আলোয় রাঙা বাসন্তী সন্ধ্যায় উঠতি বাঙালি দের মন থাকে উত্তেজনাপূর্ন রহস্যময় অনুভূতিতে ভরপুর। সেই উত্তেজনার বারুদে একটুখানি উস্কানির রং দিতে দোল উৎসব ঝাঁপিয়ে পড়ে দখিনা বাতাসের মতো। পাড়ার আড়ুয়া বেবাট ছেলেটাও প্রেমে পড়ে ঝুপ করে। গোঁধুলির রাঙা আলোয় ছাদের উপরে দখিনা হাওয়া নীরবে স্বাক্ষী হয়ে যায় চার চক্ষুতে চাওয়ার মহেন্দ্র ক্ষণের । ক্ষীণমধ্যা শ্যামাঙ্গী গ্রীবা বাঁকিয়ে জানালার পর্দা আলতো সরিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে  বিনিময় করে এক ঝলকের দৃষ্টি, আর ফেসবুক জামানার তরুণীদের “ফিলিং মন খারাপ” স্ট্যাটাসে প্রাণ বিসর্জন দেয় হাজারো যুবক । দোল উৎসবের বাহানায় এক চিলতে আবির হাতে প্রেমিকার গন্ড স্পর্শ করার অভিযান নিশ্চয়ই প্রেমাবেগের আগুনে পূর্ণাহুতির ঘি ঢালে সাড়ম্বরে। অন্যদিকে দোল উৎসবকে ঘিরে রচিত হয়েছে গান, কীর্তন, ঠুমরি, বাংলা সিনেমার গান আর বোম্বের এটমবোম আইটেম সং যা উপমহাদেশের সংগীতকে করেছে সমৃদ্ধ।

উপমহাদেশে বাঙালিদের  দোল আর অবাঙালিদের  হোলি। কথা কিন্তু একই। রঙের উৎসব। বসন্তের মাতাল হাওয়াকে আরও রঙিন করে তুলতেই এই উৎসব। শুরুটা সেই মধ্যযোগীয় শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন থেকে। দোল মূলত বৈষ্ণব উৎসব। যা আজকে সার্বজনীন থেকে সর্বজনীনতর। ভারতীয় মাইথোলজি অনুসারে দোল উৎসবের শুরুটা সেই দ্বাপর যুগে প্রেমের গুরু শ্রীকৃষ্ণের সাথে রাধারানী আর তাঁর সখীদের আবির খেলা দিয়ে।  অর্থাৎ শীতের প্রকোপ শেষে হালকা রোমান্টিক দখিনা বাতাসে কেষ্ট ঠাকুরের সাথে সখীদের আনন্দঘন রং বিনিময় দিয়েই দোলের শুরুটা হয়।  যা হালের দীপিকা পাডুকোনের বালাম পিচকারি হয়ে লন্ডনের বিখ্যাত ট্রাফালগার স্কয়ারে এসে বহুজাতিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

মধ্যযুগীয় শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন এবং বৈষ্ণব পদাবলী অনুসারে জানা যায় ফাল্গুন মাসের ভরা পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণ রাধারাণী এবং সখীদের সাথে মেতেছিলেন ভালোবাসার রংয়ের উৎসবে। সেই থেকেই শুরু। তবে কৃষ্ণ কি ঘুনাক্ষরেও জানতেন যে তাঁর জন্মের পাঁচহাজার বছর পরে বালাম পিচকারি গানে নেচে নেচে আধুনিক ইয়ো ম্যানরা হ্যাপ্পি হোলি বলে রংমেখে সেলফি মেরে ইন্সটাতে পোস্টাবে ? তবে যাই বলিনা কেনো হোলি বিষয়কে উপজীব্য করে আমরা যে গানগুলো পেয়েছি, যে অনুভূতি পেয়েছি, বিশ্বব্যাপী রং ছড়িয়ে দেওয়ার যে উপলক্ষ পেয়েছি তাতে কেষ্ট ঠাকুরকে ধন্যবাদ না দিলে নিমকহারামী হবে বৈকি। আমার ব্যাক্তিগত অভিমত হলো হোলির রং আসলে শুধুই রঙের খেলা নয় বরং রঙের ছটায় জীবনের ক্লেদ মুছে নতুন উদ্যোমে জীবনকে উপভোগ করার সূচনা।

বাঙালি হিন্দুদের জন্য ফাল্গুনী পূর্ণিমা শুধুই প্রেমের জন্য নয় অন্য একটি কারণে গুরুত্ব পূর্ন, তা হলো এই দিনই মানবতা এবং মানবিকতার অগ্রদূত শ্রী চৈতন্য দেব জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীচৈতন্য দেবের দিদিমার বাড়ি আমার বাড়ির অদূরে ঢাকাদক্ষিনে। সেই হিসাবে বৈষম্যহীনতা এবং হিন্দু জাতিভেদ ট্যাবু ভাঙার অন্যতম প্রতিকৃত শ্রী চৈতন্য দেবের প্রতি দুর্বলতা রয়েছেই। রয়েছে গোটা চৈত্রমাস জুড়ে ঢাকাদক্ষিনস্থ চৈতন্যদেবের জন্মোৎসবের মেলায় কাটানো শৈশবের বর্ণিল স্মৃতি।সেই হিসাবে ফাল্গুনী পূর্ণিমা আমার জন্য ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে। অন্যদিকে দোল পূর্ণিমায় আবহমান বাংলার সবচেয়ে কুষ্টিয়ার ছেউঁড়িয়ায় অসাম্প্রদায়িক বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইজির আশ্রমে চলে হোলির রং আর দেহতাত্বিক বাউল গানের মিলনে অসাম্প্রদায়িকতা আর বৈষম্যহীনতার সাঙ্গীতিক মহাযজ্ঞ। বাউলরা পুরো শুক্ল পক্ষ জুড়ে অহর্নিশ বাউল দর্শণে ডুবে থেকে জাগতিক কাম ক্রোদের উর্ধে উঠে মানব মুক্তির উপাখ্যান করেন ।

যাইহোক ফিরে আসি মূল বক্তব্যে। আটপৌরে বাঙালি হিন্দু গৃহস্তের বাড়িতে দোল পূর্ণিমায় আয়োজন করা হয় দোল উৎসব। দুপুরে খিচুড়ি ভোগ আর কেষ্ট ঠাকুরের পায়ের আবির মাখিয়ে শুরু হয়ে দোল যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা। ছোটরা বড়দের পায়ে আবির ছুঁইয়ে আশীর্বাদ নেয় মাথা পেতে আর সমবয়সী, প্রিয়তম  অথবা রঙ্গরসের সম্পর্ক স্থানীয়দের সাথে আপাদমস্তক আবিরস্নান করে ভালোবাসার রঙে রঙিন করে আবহমান বাংলার বাসন্তী আসন্ধ্যা। কীর্তনের শুরুটা গোঁধুলির সময়ে আর শেষ হয় রাত দুপুরে। গোলাকার হয়ে বসে গাওয়া হয় ৭ মাত্রার ত্যাওড়া তালে রচিত শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন। যেখানে কেস্ট ঠাকুরের সাথে সখীদের খুনসুটি বর্তমান। দোল উৎসবের দিনে পুরাতন কাপড় পরে কীর্তনিয়া গোল হয়ে বসেন গৃহস্তের উঠোনে । সেদিন থাকেনা আবির আর রঙের বাহারে কাপড় নষ্ট হওয়ার অজুহাত।চলে অবিরাম আবির আর রঙের খেলার উৎসব। চলে গান। সনাতন হিন্দুরা আবিরকে ভালোবাসা আর বন্ধনের প্রতীক মনে করেন। তাইতো এখনো বিয়ের সাতপাঁকের প্রতি পাঁকে কনে আবির ছিটিয়ে নতুন যুগল জীবনকে বাঁধতে চান ভালোবাসার বন্ধনে। দোলের কীর্তনের অনেক গানের কথাই মনে নেই তবে একটা গানের কথা হলো এমন যেখানে সখীরা কৃষ্ণের বাঁশি চূড়া কেড়ে নিয়ে তাঁকে রমণী সাজানোর পায়ঁতারা করছে:
নাকের উপরে লাল বেসর দেবো
প্রাণ নাথ বন্ধুরে আজি রমণী সাজাবো।
নীলাম্বরী পরাবো, কৃত ধরা খসাবো
নারী হইয়া মোহন বাঁশি আমরা বাজাবো …..

আরেক গানে পূর্ণিমা রাতে শ্যামকে নিধু বনে এক পেয়ে সখীরা অদ্ভুত এক হোলি  খেলার পায়ঁতারা করছে যা এক সময় শিল্পী পলাশের কণ্ঠে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, যদিও শিল্পী গানের আদি তালকে বাদ দিয়ে ভিন্ন তালে গানটি উপস্থাপন করেছিলেন , গানটির  কথা গুলো হলো এমন
ও শ্যাম রে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম এই নিধু বনে
আজ হোলি  খেলবো রে শ্যাম।

তবে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের পদাংক অনুসরণ করে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বেনারস ঘরানায় যুক্ত হয় এক ধরণের ঠুমরি যাকে বলাহয় চৈতি। অর্থাৎ চৈত্র দিনের বিচ্ছেদ গাঁথা। যে সব চৈতিতে থাকে বিচ্ছেদ বিলাসের রং আর মিলনের আকুতি, থাকে বসন্তের রঙের ছটা । আমি নিশ্চিত অনেকেই বেনারস ঘরানার ঠুমরি সম্রাজ্ঞী গিরিজা দেবী, অথবা পূর্ণিমা চৌধুরীর কণ্ঠে শুনেছে চৈতি’র ঠোমক। অনেকগুলো চৈতির মধ্যে আমার প্রিয় ঠুমরি হলো
চৈত মাসে চুনারি রাঙা দে রে রামা …

অথবা পন্ডিত ছান্নু লাল যখন দরাজ কণ্ঠে বেনারসি ঠুমরি ধরেন
রং ঢারঙ্গে ঢারঙ্গে রং ঢারঙ্গে ঢারঙ্গে
সাবার রঙে লাল কারদুংগি…
নারী বানায়িকে নাচনা চাওগি
তব মৃদঙ্গে  তাল বাঁজাওজি ….
তখন মনে হয় বসন্তের সব রং তিনি ঢেলে দিচ্ছেন জাগতিক কাম ক্রোধ মোহ আর মাৎসর্যকে ঢেকে দিতে। এইখানেও সখি কতৃক কৃষ্ণকে নারী সাজিয়ে নাচানোর ষড়যন্ত্রের আঁচ পাওয়া যায়। এভাবেই প্রান্তিক গৃহস্তের দোল আর বেনারসের ঠুমরি চৈতি সংগীতের অভিন্ন ত্রিবেণী সঙ্গমে মিশে যায় একই স্রোতে ।

ঠুমরির ঠোমক আর দোলের রং উস্কানিমূলক ভাবে ছুঁয়েছিলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। আমরা সবাই ঠাকুরের জন্য গান করি কিন্তু কবি গুরু একমাত্র ঠাকুর যিনি আমাদের অনুভূতি ধারণ করে গান লিখেছেন। গান লিখেছেন দোল উৎসবকে নিয়ে, বসন্তের মাতাল বাতাসের বারতা নিয়ে। শান্তিনিকেতনে প্রাকৃতিক আবহে দোল উৎসব উদযাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন । উদাত্ব আওয়াজে বলেছেন  ….
ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল
লাগল যে দোল
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।
দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্ …..

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের আহ্বানের সাথে একই সুরে শচীন কর্তার উদাস করা  সুরে শোনো গো দখিনা হওয়া গানের পালে রঙের বাহার ছড়ায় আবহমান বাংলার দোল উৎসব।

হোলির গান নিয়ে কথা বলতে গেলে রাত ভোর হয়ে যাবে মাগার কথা শেষ হবেনা। তবে দোল উৎসব নিয়ে ধামাইল আর ঝুমুর গানও কিন্তু রঙের আভা ছড়ায় আবহমান বাংলার প্রান্তরে।
স্পষ্টতই একটা ধামাইল গানের কথা মনে পড়ছে যেখানে বাৎসল্য প্রেমের তীব্রতা বুঝাতে পদকর্তা লিখেছেন
.হোলি খেলা হইলোরে সুবল চল ফিরিয়া ঘরে যাই
আমার মায়ে বুঝি মনে করে, আমি সঘনে বিষম খায়।
হস্তে লইয়া সর নবনী, ডাকে আমার মা জননী
অস্তে গেলা দিনমনি বিলম্বের আর কার্য নাই …..
অর্থাৎ কৃষ্ণ সুবল সখাকে বলছেন অনেক হোলিখেলা হলো এবার ঘরে যাবো, মায়ের কাছে যাবো । অর্থাৎ কৃষ্ণ সখীদের সাথে হোলির পার্টি ছেড়ে মায়ের কাছে যেতে চান মায়ের চিরায়ত বাৎসল্য প্রেমের টানে।

একই সময়ে রাঁড়বঙ্গীয় প্রোষিতবর্তীকা ঝুমুরের তালে মহুয়ার আবেশে দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলছেন
বসন্ত আসিলো সখি শাইড় শাঁখা নাই রে
আইলো রে পরমা পরব কার  সঙ্গে নাচিব রে ….

সেই সাথে  বাউল প্রিয় বাংলার এই পুরুলিয়া জেলাতে হোলির সময় ঐতিহ্যবাহী ছো নাচ, দরবারী ঝুমুর, নাটুয়া নাচ এই সমস্ত সংস্কৃতি হোলির আনন্দকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।

এ নিয়ে টলিগঞ্জ সিনেমা পাড়ায় হয়ে গেছে মহা হুলুস্থূল। লেখা হয়েছে অজস্র সংগীত। এর মধ্যে অপর্ণা সেন আর শতাব্দী রায়ের লিপে সেই বিখ্যাত গানটির কথা কি মধ্যবিত্ত বাঙালি ভুলতে পারে ? হ্যাঁ, একান্ত আপন ফিল্মের সেই গানটি যার কথা লিখেছিলেন স্বপন চক্রবর্তী, সুর দিলেন আরডি বর্মন আর গাইলেন আশা ভোঁসলে আর কবিতা কৃষ্ণমূর্তি
” খেলবো হোলি রং দেবোনা তা কি করে হয় …’
বসন্ত বিলাপ ছবিতে সুধীন দাস গুপ্তের কম্পোজিশনে আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘ও শ্যাম যখন তখন খেলনা খেলা এমন …’গানটি আজও হোলির রং নিয়ে খেলা করে বাঙালি আবাল বৃদ্ধ বণিতার হৃদয়ে। সেই সাথে ভূমি ব্যান্ডের সুরজিতের কণ্ঠে মহুয়ার মাতাল করা সুরে “ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে চল পালিয়ে যাই  ….” গানটি নিঃসন্দেহে রোমান্টিক বাঙালি হৃদয়ে নাগরিক যন্ত্রণাকে দুপায়ে দলে দূরদেশে পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে উস্কে দেয়। বাসন্তী পূর্ণিমা রাতে  ফুরচুঙ্গি দেয় ঘর ছাড়া বোহেমিয়ান হয়ে পালিয়ে যেতে।

অন্যদিকে নজরুলের ব্রজগোপীরা যখন নবঘন শ্যামের সাথে হোলি খেলে তখন মনে হয় রাধাকে জয় করতে রঙের পিচকারীর বিকল্প নেই। হয়তো সেই পিচকারীর রেফারেন্সে দীপিকা পাডুকোন চিকন কোমরের ঠুমকায় বালাম পিচকারি দিয়ে হুতাশন বইয়ে দেন অজস্র ভক্তদের। অন্যদিকে অমিতাভ বচ্চনের দুহাতের নাচ, দরাজ কণ্ঠ  আর মাতাল করা তালে সিলসিলে ফিল্মের  রং বারষে ভিগে  চুনার ওয়ালী আর শোলে ফিল্মের হোলি হ্যায় সহ হালের বলিউডের অজস্র গান এনে দেয় হোলির উৎসবময় উদ্যম।
আসলে আমাদের বাংলার সুর তাল লয় যখনি ঠিক ঠাক ভাবে বলিউডে প্লেস করা হয়েছে তখনি সেটা ইতিহাস তৈরি করেছে। যেমন ‘গাইড’ ফিল্মে হোলির সিনে লতাজীর কন্ঠে ‘পিয়া তুসে নেয়না লাগেরে ..’ গানে শচীন কর্তা খুব চৌকশ ভাবে আবহমান বাংলার দোল উৎসবের ট্রেড মার্ক তেওড়া তালে একটু আধুনিক ছাপ দিয়ে ব্যবহার করেছেন যা আজও বলিউড ইন্ড্রাস্ট্রিতে অন্যতম স্থান দখল করে আছে।

বারো মাসে তেরো পার্বনময় সনাতনী ফ্যাস্টিভ্যালের মধ্যে ব্যাক্তিগত ভাবে হোলি আমার খুব পছন্দের একটি উৎসব। ভরা বসন্তের মন কেমন করা শেষ বিকেলে শুরু হওয়া দোলের কির্তন, হোলির রংয়ের বাহার, বিচ্ছেদ শেষে রাই শ্যামের প্রেম , ত্যাওড়া তালের সংগীত আর ঠুমরির ঠোমক আমাকে টানে দারুন ভাবে।
বেনারস ঘরানার ঠুমরি ‘চৈতি’, সিলেটের ধামাইল ‘ নজরুলের ব্রজ গোপি খেলে হোরি, মানবেন্দ্র মুখার্জির দোলে দোদুল দোলে দোলনা  থেকে শুরু করে টালিগঞ্জের বাংলা ফিল্মের গান  ভায়া হয়ে বলিউডের বালাম পিচকারি আর রাং বারসে ভিগি চুনারিয়ার মতো মাতাল করা ধুম পিচাক ধুম রিদম হোলির রংয়ে ছড়ায় আনন্দের তীব্রতা।
সেই মধ্যে যোগীয় শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন এবং পরবর্তীতে  বৈষ্ণব  পদাবলী  থেকে শুরু করে সংগীতের নানা বাঁক বেয়ে হালের বালাম পিচকারি অথবা বাংলার কোনো হতদরিদ্র বস্তিবাসী থেকে শুরু করে ট্রাফালগার স্কয়ার আর টাইম স্কয়ারের বহুজাতিক হোলি উৎসব  অর্থাৎ বৈষম্যহীন ভাবে দোল হয়ে উঠে সকল কালের, সকল সময়ের, সকল রঙের মানুষের সম্প্রীতির প্রতীক। সার্বজনীন এই রঙের হোলি  দূর করুক বিশ্বজোড়া ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা আর হত্যার রাজনীতি। রং লাগুক সকলের প্রাণে, আমার প্রাণে ….
রং যেনো মোর মর্মে লাগে
আমার সকল কর্মে লাগে …
রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও, যাও গো এবার যাবার আগে  ….

Advertisements

আমাদের ডিম ভাজি ভাতের দিনগুলো


20190204_154339শিবগঞ্জের ব্রাহ্মন পাড়ায় আমাদের চৌচালা টিন শ্যাডের মেস বাড়িতে ছিলো আনন্দের বান। ছিলো বন্ধু, বন্ধুত্ব । ছিলো অফুরান আড্ডা। ছিলো গান। ছিলো প্রেম অপ্রেমের আখ্যান। ছিলো গদ্য কবিতা লেখার অপচেষ্টায় মশগুল সদ্য গোঁফ উঠা তারুণ্য। ছিলো খুবই নগন্য জিনিসের জন্য মনখারাপের মধুকর ডিঙা।

লিটল ম্যাগ আর সাহিত্য নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলতো হরহামেশা , সেই সাথে মিনি অডিও রেকর্ডারে জগন্ময় মিত্র, সতীনাথ থেকে শুরু করে শ্রীকান্ত আচার্য, নচিকেতা, সুমন,অঞ্জন দত্ত সহ যাবতীয় সব শিল্পীর গানের সাথে হালের বোম্বে ভাইকিংস, ফাল্গুনী পাটক আর বলিউড ফিল্মের গান।

রাতভর কলব্রিজ আর টুয়েন্টিনাইনে তাস পেটানোর পরে দুপুর রাতে পেটে ছুঁচো দৌড়ানো শুরু হলে হালকা তেলে কয়েকটা শুকনো মরিচ ভাজা আর সমুদ্র মন্থনে উঠে আসা দুনিয়ার তাবৎ খাদ্যের অন্যতম কুক্কুট ডিম্ব ভাজি ….

আহা, গভীর রাতে সেই ভাপ উঠা শেফালী ফুলের মতো শাদা ভাতের পাতে এক টুকরো ডিম ভাজি আর একখানা শুকনো মরিচের বাহারে আমাদের চৌচালা মেস বাড়ির কাছে হার মানতো জাগতিক দুনিয়ার পাঁচতারকা হোটেলও। সে এক অন্য জীবন ছিলো আমাদের। ছিলো সে এক উস্কানিমূলক সময়। রাজহংসের পালকে যেমন জল স্পর্শ করলেও স্থায়ীস্থায়ী হতে পারেনা। ঠিক তেমন কোনো দুঃখই আমাদের ছুঁতে পারতো না সেই দুরন্ত সময়ে।

Mouni’র সুবাদে ইদানিং শুধু ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাওয়াটা অকল্পনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। তাড়াহুড়ো করে হলেও সে ডিম ভাজির সাথে অন্য কিছু একটা তৈরী করবেই। গত কয়েকদিন ধরে আমার একমাত্র কন্যা আরুষি তাঁর মা কে নিয়ে মাসির বাড়ি গেছে। সেই সুযোগে বহু দিন পরে ফিরে গেলাম সেই সময়ে। যে সময়ে একটা ডিমভাজি ভাগাভাগি করে খেয়েও খেদহীন মনে কেটে গেছে দিনগুলো ।

আমার ধারণা এযাবৎ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত সফল বাঙালি আছেন বিদ্যায় শিক্ষায় বুদ্ধিতে তাদের সকলের অগ্রযাত্রার পেছনে নীরবে যুগের পর যুগ যে বিষয়টি অকৃত্তিম বন্ধুর মতো সহযোগিতা করে যাচ্ছে তা হলো ডিম। এর জন্য বাংলা শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা সবকিছু মুরগির এই মহান আত্মত্যাগের কাছে ঋণী। যে ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়। কিন্তু তবুও ডিম নিয়ে একমাত্র সাগর কান্তি দেব নামের এক ক্ষেপাটে ছেলে ছাড়া কেউই রচনা করেননি তেমন কোনো কাব্য কিংবা গল্পগাঁথা।
ডিমের ঋণ শোধ করার জন্য জয় গোস্বামীর কাছথেকে ধার করে সামান্য পরিবর্তন করে দুটি লাইন

কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি আমার সামনে দাড়ালেই আমি
তোমার ভিতরে একটা বুনো মুরগি দেখতে পাই।
ওই মুরগিতে একটা ডিম লুকিয়ে আছে।
অনেকদিন ধ’রে আছে। কিন্তু আশ্চর্য যে
এই ডিমে জল, বাতাস, রৌদ্র ও সকলপ্রকার
কীট-বীজাণুকে প্রতিরোধ করতে পারে।
এরপচন নেই।
বন্য প্রাণীরাও এর কাছে ঘেঁষে না।

মিষ্টি-রুইয়ের ঝোলকাহন


ডিম ভাজি আর ভাত ভাজির গল্প শুনতে অনেক ভালো লাগে। নস্টালজিক হওয়া যায় । দুই তিন বেলা খেতেও মন্দ লাগেনা । এর পরে ভালো লাগালাগি তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছায় । অগ্যতা আজকে ঘুম থেকে উঠেই রান্নার এন্তেজাম করলাম।

মামাবাড়িতে অন্যান্য সবজির সাথে শীতকালে প্রচুর মিষ্টি লাউ হতো। পাকা মিষ্টি লাউ অনেকদিন সংরক্ষণ করা যায়, তাই সেই মিষ্টিলাউ গুলো পাঁকলে ঘরের শীতল মেঝেতে সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখা হতো। বর্ষায় ইলিশ মাছ দিয়ে খাওয়া হবে বলে। যারা এখনো ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে মিষ্টি লাউ খাননি অথবা রুই মাছ দিয়ে মিষ্টি লাউয়ের ঝোল খাননি তাদের জীবন একেবারেই খাল্লিবাল্লি।

যাইহোক ফ্রিজ থেকে রুই মাছ বের করে জলে ছাড়লাম। হায়রে মাছ জলে নামলো ঠিকই তবে সন্তরণের তরে নহে। ডিফ্রস্ট হইবার তরে । সেই সাথে গত গ্রীষ্মে ব্যাক গার্ডেনের চারটা মিষ্টি লাউয়ের মধ্যে শেষ দুইটার একটাকে উৎসর্গ করে এন্তেজাম হলো মিষ্টি লাউ দিয়ে রুই মাছের ঝোল। ঝোলের নাম দিলাম মিষ্টি-রুই ঝোল । সাথে ডাল আর ভাত।

ফালি ফালি করে কাটা গাঢ় হলুদ রঙের মিষ্টিলাউ গুলো দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো কোনো পাহাড়ি রসালো পাকা পেঁপে। অন্যদিকে মাছ গুলোকে পরিষ্কার করে তাতে হলুদ মরিচ লবন মাখিয়ে ছাড়া হলো গরম তেলে।
খেয়াল করে দেখেছেন, আমাদের আশেপাশে অনেক মানুষ আছে যারা একেবারেই নুনের মতো। ঝোলে অম্বলে স্বাদ বাড়াতে অথবা বিস্বাদ করতে নিজ দায়িত্বে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন । ওপার বাংলায় এদেরকে বলা হয় “সর্ব ভোগের কাঁঠালি কলা”।

যাইহোক, গরম তেলে মাছ ভাজতে দিয়েই আমার মনের মধ্যে মাছের মায়ের পুত্র শোকের মতো শোক উছলে উঠলো। সেই শোক নিবারণ করতে দরকার জলের। জল খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পাওয়া গেলো সেবারে স্কটল্যান্ড থেকে আনা গ্ল্যানকো ভ্যালির উচ্ছন্নে যাওয়া জলের বোতল। তলানিতে চুপটি করে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা সেই সোনালী জলে চুমুক দিয়েই ভাজামাছ উল্টাতে গিয়ে ভাবলাম, আহারে, কেনো আমি ভাজা মাছ উল্টাতে অনেকটাই শরমিন্দা টাইপের ?

মাছ ভাজা হলো। এবারে হালকা আঁচে কড়াইতে দেওয়া হলো তেল। গরম তেলে তেজপাতা দিতে গিয়েই মনে হলো শালার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো মাইরি। তা না হয়েগেবনটা হয়ে গেলো একেবারে শুকনো তেজপাতা। বুকে আবারো দুঃখের আফাল উঠলো। অগ্যতা আফাল নিবারণের লক্ষ্যে চুমুক দিলাম স্কটিশ ইচ্ছে নদীর জলে। সেই সাথে ওম স্বাহা বলে গরম তেলে একে একে দিলাম রাঁধুনি, অল্প পাঁচ ফোড়ন, কয়টা শুকনো মরিচ।
ফোড়ন থেকে ঝাঁজ বেরোনোর সাথে সাথেই পূর্ণাহুতির ঘি ঢালার মতো করে যাবতীয় কাম,ক্রোধ, লোভ, মোহ,মাৎসর্য ত্যাগ করেকরে ঝপাং করে ঢেলে দিলাম ফালি করে কাটা মিষ্টি লাউ। দিলাম গুঁড়ো মরিচ, হলুদ, জিরা আর হালকা ধনিয়া। আবারো সর্বভোগের কাঁঠালি কলাকলা ” লবন”দিলাম তাহাতে ঢালিয়া ।
আমার মনে আছে আমাদের ক্ষেতের লাউ ভাজি করতে গেলে মা তাতে একটু মিষ্টি দিতেন। একান্নবর্তী পরিবারের সবাই সেই ভাজি খেয়ে মিষ্টি লাউয়ের মিষ্টত্বের প্রশংসায় হতেন পঞ্চমুখ। সবাইকে বোকা বানিয়ে মা হাসতেন বিজয়ীর হাসি। মাঝে মধ্যে নিজেকে বোকা বানিয়েও সুখ। সেই সুখ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। তাই মিষ্টি লাউয়ের মিষ্টত্ব বাড়াতে দিলাম চিনি ঢেলে।
একটু কষানো হয়ে গেলে কড়াইতে জল ঢেলে নিজেও আরেকটা চুমুক দিলাম ইচ্ছে নদীর জলে।

অতঃপর ভাজা মাছ ঝোলে ঢেলে দিয়ে উপরে হালকা পাঁচ ফোড়নের গুঁড়ো আর জিরে গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়ে দিলাম চুলার আগুন বন্ধ করে। সেই সাথে মনের আগুন নিভানোর জন্য ইচ্ছে নদীর জলের পাত্র শূন্য করে ঢেলে দিলাম গলধঃকরণের তরে।

এভাবেই হয়ে গেলো ঐতিহাসিক মিষ্টি রুই ঝোল।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। এই রান্নাটা বাসায় একা একা ট্রাই করবেন না। আমাকে নিমন্ত্রণ দিয়ে এন্তেজাম করবেন।

দেশ না ছাড়িলে দেশ মিলেনা কিস্তি -৬


মজার বিষয় হলো আমার লন্ডনবাসের একেবারে প্রারম্ভিক সময়ে আমি কয়েক সপ্তাহ এসেক্স কাউন্টির ক্লোন নামে ছোট একটি নদীর তীরে আর্লস ক্লোন নামে একটা ভয়ংকর সুন্দর গ্রামের এক রেস্টুরেন্টে কয়েক সপ্তাহ বেয়ারার কাজ করেছিলাম। রেস্টুরেন্টের নাম ছিলো ক্লোন ভ্যালি। ফ্যামিলি রান রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের মালিক উনার ছোট ভাই, ভাইস্তা, ছেলে এবং মেয়ের জামাই সবাই মিলে একসাথে কাজ কর্ম করে রেস্টুরেন্টটা পরিচালনা করেন। এর মধ্যে একমাত্র বহিরাগত ছিলাম আমি। প্রথম দিন থেকেই তারা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। ভালোবাসার আরো একটা কারণ পরে বুঝলাম। আমি আসলে রেস্টুরেন্টের কাজের শিফট বিষয়ে খুবই অজ্ঞ ছিলাম। সেজন্য সকালে উঠেই নাস্তা করে কাজে নেমে পড়তাম। সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই নিজের কাজ শেষ করে রাখতাম। একইভাবে বিকালে ছয়টায় রেস্টুরেন্ট খোলার কথা থাকলেও আমি সাড়ে চারটায় কাজ শুরু করে সবকিছু রেডি করে ছয়টা বাজার অপেক্ষা করতাম। আমার ধারণা ছিলো সকালে এগারোটায় রেস্টুরেন্ট ওপেন অর্থাৎ এর আগেই সবকিছু রেডি করতে হবে। তেমনি বিকালে ছয়টার আগেই সব তৈরী করে রাখতে হবে। রেস্টুরেন্টের মালিক তো মহা খুশি। খুবই করিৎকর্মা ছেলে। সেইজন্য দুপুরে আমাকে ল্যান্ডলাইনে হ্যান্ডসেট ও দেওয়া হলো বুকিং নেওয়ার জন্য। আমিও গাঁধার মতো দায়িত্ব নিলাম। মালিক গিন্নি প্রায়শঃই বাসা থেকে নিজের হাতের রান্না করা খাবার দাবার নিয়ে আসতেন আমার জন্য। ষাটোর্ধ মালিক ভদ্রলোক খুব শিক্ষিত না হলেও হেমন্ত মান্না দে’র গানের খুব ভক্ত ছিলেন। এতো বছর পরেও তাঁদের সৌজন্যতার কথা ভুলিনি। যদিও কাজের শিফট বিষয়ে তারা নিজে থেকে আমাকে কিচ্ছু জানাননি।
ওই রেস্টুরেন্টের মালিকের ভাইস্তা ছিলো একাধারে খুবই ভালো মানুষ তবে একেবারে ক অক্ষর গোমাংস । তার অশিক্ষিতপনায় একবার ধরা খেতে খেতে বেঁচে গেছি। রেস্টুরেন্টের পাশেই ছিলো কোপারেটিভ সুপার শপ। একদিন সকালে ভাইস্তা বললো ভাই কো-অপ থেকে দুইটা “বলকলি” আর কিছু “পেপসিকাম” নিয়ে আইসেন। আমি বুঝলাম পেপসিকাম মানে ক্যাপসিকাম। কিন্তু “বলকলি” কি বস্তু ? সুপার শপের সবজি সেকশনে গিয়ে অনেকটাই ধাঁধার উত্তরের মতো খুঁজে পেলাম “বলকলি” শব্দের মানে। আসলে ভাইস্তা বলেছিলো ব্রোকলি আনতে ।

ইত্যবসরে ব্রিটেনে চলে এলে গ্রীষ্মের আভাস। এর মধ্যে হ্যালুইন, ক্রিসমাস, বক্সিং ডে এবং নিউইয়ার পেরিয়ে হটাত একদিন সকালের ঝলমলে সোনা রোদ আর এক চিলতে বাগানের টিউলিপ আর নার্সিসাস ফুলের যুবতী পাপড়ি গুলো জানান দিলো সদ্যাগত বসন্ত দিনের। ধীরে ধীরে জওয়ান হতে থাকা সূর্য হাঁটতে শুরু করলো গ্রীষ্মের পানে। সাথে হাত মিলালো সামার পানজি, প্রিমরোজ, বিজিলিজি, জিরেনিয়াম, পিচুনিয়া , স্নুপ ড্রাগন সহ হাজারো ফুলরাজি। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই আলোর ছটা , স্বল্প বসনার ছড়াছড়ি আর রঙিন পোশাকে মানুষের হাসি মুখ। আমার প্রথম ব্রিটিশ গ্রীষ্ম বিলাসের সঙ্গী ছিলো সদ্য দেশ থেকে আসা বন্ধু প্রতিম মুজাক্কির ভাই। প্রায়শঃই আমার ছুটির আগের দিন রাতে কাজ শেষে চলে যেতাম মুজাক্কির ভাইয়ের কিংক্রসের ফ্ল্যাটে। সারারাত আড্ডাবাজি, ফিল্ম দেখা, নাটক দেখা শেষ করে পরদিন সকালে আট কি নয় মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা নিয়ে আমরা বেরিয়ে পরতাম মহামান্য রানীর দেশের রাজধানী দর্শনে। আহা কি আনন্দ আর নির্ভাবনাময় ছিলো সময়গুলো।

ওই সামারেই ব্রাডি আর্টস সেন্টারে একই স্টেজে সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা কবিতায় সিলেট উদীচীর মাধব দা’র সুরে “বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ন করো চিত্ত …” গণসংগীত গাইলাম বিখ্যাত শিল্পী অনুপ ঘোষালের সাথে।

এভাবেই নানা ব্যস্ততা, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা আর চরম ব্যাস্ততায় চলেগেলো একটি বছর। আবারো অক্টবর, আবারো দূর্গা পূজা, আবারো হ্যালোইন আবারো সেই মনখারাপের বিকাল, হিম হিম নিতম্বভারী করা মেঘলা আকাশ। তবে এবারের উইন্টার আর বেশি মনখারাপের কারণ হতে পারলোনা কারণ জানুয়ারিতেই দেশে যাচ্ছি। টিকেট কনফার্ম।

তখন আমি কাজ করি হিথ্রো এয়ারপোর্টের কাছে অস্টারলি বলে একটা জায়গায়। একদম শিক্ষানবিস থেকে মধ্যমানের অভিজ্ঞ ওয়েটারে উন্নীত হয়েছি। সেই সাথে আরো একটি পার্টটাইম জব করি। সেই রেস্টুরেন্টের এক খদ্দের সত্তরোর্ধ গোরা ভদ্রলোক। নাম মাইকেল বার্লি । যিনি প্রায় প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে খেতে আসতেন ওই রেস্টুরেন্টে । তাঁর সাথে দেশ বিদেশ বিষয়ে অনেক কথা হতো। তিনি জানতেন দেশভাগ থেকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্প। খ্রিস্টমাসের আগের রাতে তিনি খেতে এলে বললাম যে আমি জানুয়ারিতে দেশে যাচ্ছি। শোনে খুবই খুশি হলেন। আমার পরিষ্কার মনে আছে থার্টিফাস্ট নাইটে রেস্টুরেন্টে খেতে এসে তিনি রেস্টুরেন্টের মালিকের সামনে আমাকে একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে মজা করে বললেন “ডোন্ট শো দিস টু গ্রিডি ওউনার”
রাতে কাজ শেষে ফ্ল্যাটে ফিরে খাম খোলে দেখি চারটা চকচকে পঞ্চাশ পাউন্ডের নোট আর একটা চিরকুটে লেখা “হ্যাপি নিউ ইয়ার এন্ড হ্যাভ এ সেইফ জার্নি অসীম” । নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে এলো। এভাবে আজো বহু মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। প্রতিবারই চোখ আদ্র হয়ে উঠে। এক জীবনে এর চেয়ে আর খুব কি বেশি দরকার …..(চলবে)

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার এবং কাঁঠালের আমসত্ব


বিশ্বের সব দেশের নির্বাচনেই ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে নির্বাচনী ইশতেহার অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের ইশতেহারে ছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। যা ব্যাপক ভাবে তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করেছিলো। যে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মহাজোট সরকার অনেকটাই সফল হয়েছিলো। প্রায় দশ বছর পরে আরো একটি অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন প্রায় সমাগত। আজকে বিএনপি জামায়াতের বিশ দলীয় জোট কে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। একটু আগেই ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের প্রধান দফাগুলো পড়লাম আজকের পত্রিকায়। ইশতেহারের কয়েকটি পয়েন্ট যেমন ছিলো বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন । তেমনি কিছু পয়েন্ট ছিলো আশাজাগানিয়া।

অবাস্তব দফাগুলোর একটি হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলমান রাখা । যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপিকে আলিঙ্গন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারিক কার্য চলমান রাখা অনেকটা সোনার পাথর বাটির মতো। ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ বাংলাদেশ দেখেছে কিভাবে জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য বন্ধ করতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ নিয়েছিলো। সাথে ছিলো বিএনপির অকুন্ঠ সহযোগিতা। আরেকটি পয়েন্টে বলছেন ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিচার করবেন, অথচ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মাঠে ময়দানে মাইক লাগিয়ে দুর্নীতির দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার মুক্তিও চাচ্ছেন তা অনেকটাই স্ববিরুধীতার শামিল। অন্যদিকে অর্থ পাঁচার এবং ২১ অগাস্টের ভয়াবহ বোমাহামলার অপরাধে দন্ড প্রাপ্ত দেশান্তরী তারেক রহমানের মনোনীত এমপিদের নিয়ে কিভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অথবা বোমাসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেবেন তা বলাই বাহুল্য।

তবে কয়েকটি পয়েন্ট ছিলো যথোপযুক্ত। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে সেই যথোপযুক্ত বিষয়গুলো যে প্রবর্তন করতে পারবে সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যেমন সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত করবে ঐক্যফ্রন্ট সরকার। যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো সংবাদ। তবে এক্ষেত্রে বলতে হয় ২০০১ সালে বিএনপি- জামায়াত ক্ষমতায় থাকা কালে মাত্র এক বছরে রেকর্ডকৃত সংখ্যালঘু হামলার সংখ্যা ছিলো ৩হাজার ৬২৫ টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ৩৫৫টি এবং লুটপাট, অগি্নসংযোগ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, গুরুতর আঘাত, চিরতরে পঙ্গু করা, সম্পত্তি দখল ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ ৩ হাজার ২৭০টি। ধর্তব্য নয় উল্লেখ করে ১ হাজার ৯৪৬টি অভিযোগ বাতিল করারও ঘটনা ঘটে। তদন্ত করা ৩ হাজার ৬২৫টি ঘটনায় ১৮ হাজারেরও বেশি লোক জড়িত বলে চিহ্নিত হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় যেসব ব্যক্তির ওপর হামলা, লুটপাট, গণধর্ষণ করা হয়েছিল, তারা থানায় বা আদালতে অভিযোগ দায়ের পর্যন্ত করতে পারেননি। বিগত আওয়ামিলীগ আমলেও সংখ্যালঘু নির্যাতন চলেছে অবর্ণনীয় ভাবে।
জামায়াত বিএনপিকে বুকে আগলে রেখে ক্ষমতায় গেলে ঐক্যফ্রন্ট কিভাবে বাঁশখালী ট্রেজেডি থেকে শুরু করে হালের নাসির নগর হামলা, রামু বৌদ্ধ মন্দির তান্ডব সহ ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ সহস্রাধিক সংখ্যালঘু হামলার বিচার করবে সেটা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।

বলছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা। শোনেই মনে পড়ে যায় ব্যারিস্টার মইনুলের হুংকার, আসম রবের ব্যাক্তি আক্রমণ এবং ডক্টর কামাল হোসেনের উদ্যত কন্ঠস্বরে উচ্চারণ “খামোশ” গত কয়দিনে বাংলাদেশ দেখেছে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের পরমত সহিষ্ণুতার নমুনা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তেড়েফুঁড়ে আসা, দেখে নেওয়ার হুমকি অথবা নোংরাভাষায় ব্যাক্তি আক্রমণ। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সাম্প্রতিক এসব কর্মকান্ডের প্রেক্ষিতে তাদের দেওয়া মুক্তমতের প্রতিশ্রুতি খানিকটা কাঁঠালের আমসত্বের মতোই শোনায়। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো যে পরিমান ব্যয়বহুল প্রতিশ্রুতি তারা দিচ্ছেন সেই প্রতিশ্রুতি কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন তার কোনো রূপরেখা নেই। তারা বলছেন দেশের সব টাকা পাঁচার হয়ে গেছে। দেশের টাকশাল তলানিতে পড়েছে। কিন্তু কিভাবে দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি করা হবে, কিভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি কারক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি করা হবে তার যথোপযুক্ত রূপরেখা ইস্তেহারে অনুপস্থিত। সেই ক্ষেত্রে এতো এতো খরুচে প্রতিশ্রুতি তারা দিচ্ছেন সেই ব্যয়বহুল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে অর্থের যোগান কেমনে হবে তার কোনো ইঙ্গিত নেই।

অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের যে কথা গুলো ঐক্যফ্রন্ট বলছে তা একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি জামায়াতকে সাথে নিয়ে তা কতটা বাস্তব সম্মত তা হলপ করে বলা কঠিন। ঐক্যফ্রন্ট এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। বোধ করি এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ভারসাম্য আনয়ন এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কারের বাস্তবতা। তবে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের অন্যবিষয় গুলোর মধ্যে “একজন ব্যাক্তি দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না”, সরকারি চাকরির বয়সের বাধাঁ তুলে দেওয়া, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণের মতো বিষয়গুলো আশাজাগানিয়া।

আমাদের দেশে এক কোটিরও বেশি তরুণ ভোটার, এবং বিশ্বের অন্যতম তারুণ্য ভরপুর দেশ হলো বাংলাদেশ। এই দেশের সকল রাজনৈতিক এবং সামাজিক কার্যক্রমের কর্মসূচি হওয়া উচিত তরুণদের কথা চিন্তা করে। হতাশাগ্রস্ত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান না করে কখনোই মজবুত আগামী তৈরী করা যায়না। তাই সরকারের নানা প্রণোদনা এবং কর্মক্ষেত্রের বিস্তার ঘটিয়ে উদ্যোমী তরুণদের মেধা, মনন এবং তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। দেশের তরুণ বেকার জনগোষ্ঠী জনশক্তিতে রূপান্তর করা, বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনার চারটি স্তম্ভকে আরো শক্তিশালী করে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত এবং রপ্তানিমুখী আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় সকল দলের ইশতেহারের মূলমন্ত্র হওয়া খুবই জরুরি।

সিলেট-৬ এবং একজন নুরুল ইসলাম নাহিদ


বলছিলাম সিলেট-৬ আসনের মাননীয় এমপি ১৯৭১ সালের স্বশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়া নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইয়ের কথা । একজন শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে নুরুল ইসলাম নাহিদের আলোচনা সমালোচনা থাকতেই পারে, এবং এ নিয়ে মত পাল্টামত থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । তবে কাছে থেকে যতটা দেখেছি তাতে বলতে পারি একজন সৎ আদর্শবান জনপ্রতিনিধি হিসাবে একজন নুরুল ইসলাম নাহিদ গোটা বাংলাদেশে আর একটাও নেই। যার সারা জীবনের রাজনীতি জুড়ে আছে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার চেতনা এবং সাধারণ মানুষের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ। সততা, নিষ্ঠা এবং স্বাধীনতার চেতনা যার নিত্য দিনের পাথেয়।

সেই ১৯৯১ সাল থেকে চলা শুরু। আগে থেকে জাতীয় রাজনীতিতে সফল নাহিদ ভাই নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেন ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে। কাঁদা, জল পেরিয়ে পায়ে হেঁটে গোলাপগঞ্জ -বিয়ানীবাজারের গ্রাম থেকে গ্রামান্তর চষে বেড়িয়েছেন। সাথে ছিলেন গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারের তৃণমূলের সকল বাঘা বাঘা নেতারা। নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাই দুস্ত অসহায় মানুষের পাশে বসে শুনেছেন দুর্দশার কথা। তৎকালীন সময়ে শিক্ষায় দীক্ষায় গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের খুব নামডাক থাকলেও প্রদীপের তলা ছিলো অন্ধকার। বেশিরভাগ এলাকা ছিলো বিদ্যুৎহীন, মাইলের পর মাইল কাঁচা রাস্তা, স্কুল কলেজে নোনা উঠা জীর্ন ঝুঁকিপূর্ন পুরাতন ভবন,সুরমা কুশিয়ারা, কুড়া সহ বহু ছোট বড় বিধৌত গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারের বেশিরভাগ নদীতে ছিলোনা সেতু। শেওলা, চন্দরপুর,শিবপুর এসব নদী পাড়ি দিতে হতো মান্দাতার আমলের ফেরিতে।বর্ষায় ছোট ছোট খালের উপরে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতো স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীরা। বাড়ির কাছের কৈলাশটিলা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস নিয়ে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি অথচ আমাদের স্থানীয়দের কাছে গ্যাস সংযোগ ছিলো স্বপ্নের মতো। এ এক অন্ধকার যুগ ছিলো তখন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে নাহিদভাই জয়ী হতে পারেননি কারণ তখনকার সময় টানা জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সামরিক শাসনের পরে আসলে বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র এবং ভোটের রাজনীতি ততটা বুঝেও উঠতে পারেনি।
তবে ১৯৯৬ সালে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে নাহিদভাই সংসদে সিলেট ৬ আসনের জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। শুরু হয় গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার নির্বাচনী এলাকার মানুষের দিন বদলের পালা। এর পরে ধারাবাহিক ভাবে ২০০৮, ২০১৪ সালের নির্বাচনে নাহিদভাই মহান সংসদে সিলেট ৬ আসনের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলশ্রুতিতে আজকে গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারে পেয়েছি অভূতপূর্ব উন্নয়ন, সন্ত্রাসীন জনপদ আর স্কুল কলেজে উন্নত ভবন শিক্ষা সরঞ্জাম। ২০১৮ সালের এই মহেন্দ্রক্ষনে এসে যদি আমরা পেছন ফিরে তাকাই তবে দেখতে পাবো অন্ধকার থেকে আলোতে এসেছে সিলেট ৬। আজকের বাস্তবতায় সিলেট ৬ গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার আসনের প্রায় ৯৫% এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন হয়েছে, প্রায় শতভাগ রাস্তা পাকাকরণ সম্পন্ন, সিলেট ৬ আসনে এমন কোনো স্কুল, কলেজ, নেই যেখানে দেশের সবচেয়ে আধুনিক ভবন এবং শিক্ষা সরঞ্জাম পৌঁছায়নি। হয়েছে ভোকেশনাল কলেজ, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছে গ্যাস সংযোগ। সাধারণের জীবনমানের এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ২০১৮ সাল, আজ আবারো গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারবাসী আরো একটি নির্বাচনের সন্নিকটে। তবে এবার গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার বাসি তাদের পরীক্ষিত প্রতিনিধি চিনতে ভুল করবেনা।

গত দশ বছর ধরে সাফল্যের সাথে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চড়াই উৎরাই এসেছে তবুও পিছপা নানা হয়ে নিষ্ঠা এবং দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতা বিরুধী চক্রের সমন্বয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মাধ্যমে প্রগতিশীল ধ্যানধারণা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চেয়েছিলো। কিন্তু নাহিদভাই দক্ষ হাতে সেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন। শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয় তারা বইয়ের গুদামেও আগুন দিয়েছিলো। কিন্তু হাজারো বিপত্তিকে পেছনে ফেলে বছরের প্রথম দিনে কোটি কোটি বই পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর মায়েরা মুঠো ফোনের মেসেজের মাধ্যমে প্রতিমাসে পেয়ে যাচ্ছেন আর্থিক ভাতা যা দিয়ে তারা পূরণ করতে পারছেন মেয়ের ছোটখাটো আবদার। নারী শিক্ষাকে অগ্রসর করতে রয়েছে মেয়ে মাসিক উপবৃত্তি। বিভিন্ন পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর জন্য মুদ্রিত হচ্ছে উপভাষার বই। মোদ্দাকথা গত দশ বছর ধরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশাল এক শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মযজ্ঞের।

তবে দুঃখের বিষয় হলো একজন সৎ, আদর্শবান, প্রগতিশীল এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাহিদ ভাই কখনোই তাঁর মানের প্রতিপক্ষ পাননি। প্রতিবারই হয় নীতি আদর্শ বিবর্জিত দুর্নীতিবাজ সরফ উদ্দিন খসরু, মকবুল হোসেন লিচু মিয়া অথবা যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমানকে পেয়েছেন তাঁর প্রতিপক্ষ হিসাবে।
এইবার ও শোনাযাচ্ছে বিএনপি জামায়াত জোট থেকে যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের এক সাম্প্রদায়িক নেতাকে নাকি দেওয়া হচ্ছে মনোনয়ন। যা একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য চরম অবমাননাকর। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একাত্তরের খুনি, নারী ধর্ষণকারী, লুটেরা গোলাম আজম, মুজাহিদের ভাবশিষ্যকে প্রতিহত করতে হবে। আওয়াজ তুলতে হবে যৌথ কণ্ঠে। গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার থেকে কোনো যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের কেউ যদি মহান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে তবে তা সিলেট ৬ আসনের মুক্তিযোদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য হবে চরম পরাজয়। আমার ধারণা সিলেট ৬ আসনের সচেতন মানুষেরা এই ভুল করবেননা।

আমরা চাই গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারে সকল দলের সৎ এবং আদর্শবান প্রার্থী। যারা নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইয়ের মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করবে, সাধারণ মানুষের কথা ভাববেন, সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়াবেন। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হবেন । মন্ত্রিত্ব লাভ করে গোটা দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করবেন। সুউচ্চে ধারণ করবেন গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারবাসীর পবিত্র আমানত।

47392951_2370333286371181_3340597757210525696_n

লেখক
অসীম চক্রবর্তী
পিএইচডি রিসার্চার
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্ড ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম
ARITI ক্যামব্রিজ, যুক্তরাজ্য

কমরেড শ্রীকান্ত দাস :কণ্ঠে যাহার দিন বদলের গান


প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী কমরেড শ্রীকান্ত দাসের নবম প্রয়াণ দিবস আজকে। আজীবন সংগ্রামী মানুষটার সাথে পরিচিত পেরেছিলাম সেটাই বা কম কিসে?
উনার সাথে খুবই অল্প দিনের পরিচয়ে বুঝেছিলাম জীবনে বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে হলে অর্থ সম্পদে বিত্তশালী হতে হয়না, দরকার হয় বিত্তশালী একটা মনের। সৎ সাহস লাগে সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গলা ছেড়ে নতুন দিনের গান গাইতে। বিত্তশালীর মোসাহেব হওয়া সহজ কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের ঘামের শরিক হতেপারে কজন ?

কমরেড শ্রীকান্ত সারা জীবন প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন শাল্লা উদীচীকে।গেয়েছেন মানব মুক্তির গান, সংকটে সংগ্রামে প্রতিরোধে প্রতিবাদে হয়েছেন মুখর। বৃটিশ বিরুধী আন্দোলন, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, ভাটিবাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে সদা জাগ্রত ছিলো তাঁর কণ্ঠ। উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে একাই প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, নিজেকে শামিল করেছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাফেলায়।
হাছন, লালন রাধারমণ সহ আবহমান বাংলার লোকগান এবং গণসংগীতের ঝংকারে দেখতেন দিন বদলের স্বপ্ন। সুযোগ পেলেই তিনি সিলেট উদীচীতে আসতেন। মিরাবাজারের উদীচী অফিসে চলতো গণসংগীতের উৎসব। নিজের লেখা সুর করা গণসংগীতের পাশাপাশি ভালোবাসতেন গণনাট্য সংঘের গান, কলকাতা ইয়ুথ ক্যোয়ারের গান ভালোবাসতেন আরেক চারণ কবি বাহিরানা ঘরানার বাউল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান। প্রাণ খোলে গাইতেন
বাঁচবো বাঁচবোরে আমরা বাঁচবো রে বাঁচবো
ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে নয়া বাংলা গড়ব ….

সিলেট উদীচী একবার সম্মেলন উদ্বোধন করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো। আবেগে ভালোবাসায় তিনি নিজে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন, অশ্রুসিক্ত করেছেন আমাদের সবাইকে। এতো মহান হৃদয়ের একজন ত্যাগব্রতী সংগ্রামী অথচ তাঁর বিনয়, ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা, পদ পদবীর পিছনে না ছোটা এবং সাধারণের একজন হয়ে শোষনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা আমাকে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে রবীন্দ্র নাথ এতবড় একজন কবি হয়েও বলছেন
আমার মাথা নত করে দাও হে
তোমার চরণ তলে।
ঠিক যেনো একটি ফলজ বৃক্ষ ফলের ভারে নুয়ে পড়ে নিচের দিকে।

কমরেড শ্রীকান্ত দাসের রচিত একটি বহুল পরিচিত গণসঙ্গীত যা সিলেটের বিভিন্ন পথে প্রান্তরে গেয়ে বেড়িয়েছি তা হলো
কাউয়ায় ধান খাইলো রে
খেদাইবার মানুষ নাই
কামের বেলা আছে মানুষ খাইবার বেলায় নাই ….

অনেকেই ভুল বুঝে খাইবার বেলা আছে মানুষ কামের বেলা নাই বলে থাকেন। কিন্তু শ্রীকান্ত দাস আসলেই “কামের বেলা আছে মানুষ খাইবার বেলায় নাই” বলেছেন। শোষক কাঁক, শ্রমিককে (মানুষ) দিয়ে কাজ করায়, ফসল উৎপাদন করায় এবং অবশেষে কাক নিজেই ফসল ঘরে তোলে। খাবার বেলায় আর কোনো মানুষ থাকেনা। শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে শোষণ এবং বঞ্চনা।
ঠিক যেমন সিলেটের আরেক প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী ভবতোষ চৌধুরী গেয়েছেন
“বোয়ালের গণতন্ত্রে পুঁটি দের রক্ষা নাই
বিড়ালের গণতন্ত্রে ইঁদুরের রক্ষা নাই …..

আজকে কমরেড শ্রীকান্ত দাসের নবম প্রয়াণ দিবস। শ্রীকান্ত দাসের প্রয়াণ দিবসের অঙ্গীকার হোক কাকহীন সমাজ, বোয়াল হীন রাষ্ট্র এবং শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায় হোক কড়ায় গন্ডায় …..

ভবতোষ চৌধুরী : কণ্ঠে যাহার গণমানুষের গান। অসীম চক্রবর্তী


আজন্ম বিপ্লবী প্রয়াত গণসংগীত শিল্পী ভবতোষ দা’র সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো ১৯৯৪ সালের পৌষের এক অদ্ভত সন্ধ্যায়। আমার বয়স তখন তেরো কি চৌদ্ধ। স্থানীয় বাজারের এক ছোট কক্ষে মোমবাতির ম্লান আলোয় লম্বা জুলফি আর গোঁফওয়ালা ক্ষ্যাপাটে একটি লোক মানব মুক্তির কথা বলছে, শিল্পের কথা বলছে, সাহিত্যের কথা বলছে বাংলা গানের কথা বলছে, সংস্কৃতির বিকাশের কথা বলছে । সদ্য কৈশোরে পা রাখা আমি সন্মোহিত হয়েছিলাম সদাহাস্য ক্ষ্যাপাটে এই লোকের সাথে কথা বলে। এমন মানুষের সাথে এর আগে কখনোই দেখা হয়নি আমার। এর আগে এতো সহজ করে এমন ভাবে কোনদিন শুনিনি কাউকে বলতে “এ জীবন মানুষের তরে, এ জীবন শোষণ মুক্তির তরে, এ জীবন দিন বদলের তরে …

ঢাকাদক্ষিনস্থ শ্রী চৈতন্য দেবের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরে পুরকায়স্থ বাজার। পুরকায়স্থরা দেশ ছাড়া হয়েছে সেই কবে কিন্ত নামখানা রয়েগেছে এখনো। সেই বাজারে স্থানীয় কয়েক জনের সহযোগিতায় ভবতোষ চৌধুরী চৈতন্য সংগীত বিদ্যালয় নামে একটি গানের স্কুল খোলেছিলেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় দেড় ঘন্টা বাসে চেপে ক্লাস নিতে আসতেন ভবতোষ দা। নানা কারণে স্কুলটি বেশিদিন টেকেনি। কিন্তু ভবতোষ চৌধুরী মাত্র কয়েক দিনের কথোপকথনে আমার মনন বদলে দিতে পেরেছিলেন। এর প্রায় সাত বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে সিলেট শহরে আস্তানা গাড়ার পরে ২০০১ সিলেট উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত হই এবং খুঁজে পাই আমার দ্রোণাচার্য ভবতোষ দা কে।

নতুন করে আবিষ্কারের পরে ভবতোষ দা কে প্রথম প্রশ্ন করি আপনি তো বিপ্লবী গণসংগীত শিল্পী, কোনো বিপ্লবী নাম না দিয়ে চৈতন্য দেবের মতো ধর্ম প্রচারকের নামে কেনো সংগীত বিদ্যালয় করেছিলেন? উত্তরে এক গাল হেসে ভবতোষ দা বলেছিলেন এই চৈতন্য সেই চৈতন্য নয় রে পাগলা। এই চৈতন্য হলো অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর চৈতন্য, এই চৈতন্য হলো শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের চৈতন্য, স্বাধীনতা বিরুধীদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির চৈতন্য, পুঁজিবাদীর বিরুদ্ধে দিনমজুরের চৈতন্য ……

ভবতোষ চৌধুরীর গণসংগীত মহাসমাবেশে মানুষের মনে প্রতিবাদের ঢেউ তুলতো, প্রচলিত গানের সুরের সাথে প্যারোডি করে উপস্থিত গণমানুষের পালস বুঝে তিনি তাৎক্ষণিক কথা বসাতেন
তেমনি একটি গান হলো
র্জে উঠ বাংলাদেশ, লাখ কণ্ঠে বলভাই,
বোয়ালের গণতন্ত্রে পুটিদের মুক্তি নাই ….

অথবা বাউল আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান আমি কুল হারা কলঙ্কিনী’র সুরে ভবতোষ চৌধুরীর রচনা করা গান
আমি বাংলা দেশের বাঙালি,
আমারে ডর দেখাইওনা বুলবুলি ….
সাগর সাগর নদী নদী ঢালছে রক্ত নিরবদী
আমার আগের যত বাঙালি …
আমারে ডর দেখাইয়োনা বুলবুলি ….

সিলেট উদীচীর সতীর্থদের কাছে শুনেছি ভবতোষ চৌধুরী বলতেন মঞ্চে উঠে যদি ভয় পাও তবে বিপ্লব করবে কেমনে। মঞ্চ হলো রাজপথের মতো। যতো আত্মশক্তি নিয়োগ করে মিছিল ধরবা সহযোদ্ধারা ততই উজ্জীবিত হবে। ঠিক তেমনি মঞ্চে উঠে ভয়হীন চিত্তে বজ্র কণ্ঠে ধরতে হবে মুকুন্দ দাশের গান
ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে
মাতঙ্গিনী মেতেছে আজ সমর রঙে ….

16938874_10210473744991293_4226917348915805234_n

আমাদের মহান স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি ভবতোষ চৌধুরীর ছিলো আপ্রাণ আনুগত্য। যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের প্রতি ছিলো অগাদ ঘৃণা। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার হোক। আশির দশকের বৈরী সময়ে ভয়হীন কণ্ঠে গলা ফাটিয়ে মঞ্চ কাঁপিয়ে গেয়েছেন নিজের লেখা গান

ধর ধর ধর ধররে তোরা রাজাকার রে ধর
তেল চোরারে ধর, গম চোরারে ধর, আমলা রে ধর
তার মনিবরে ধর।
মা বইনেরে যারা দিছে পাঞ্জাবিদের হাতে
তারা দেখিদেখি হাসে এখন বইসে রাজ সভাতে
ধর্মের কথা শোনায় তারা মঞ্চে উইঠা গর গর গর।

একাত্তরের পরে যারা কিনছে জমি বাড়ি
ভুকা ফাঁকার দেশে যারা চালায় রঙিন গাড়ি
টাকা পয়সা কই পাইলো সে একবার তারে জিজ্ঞেস কর।

গণমানুষের কথা বলবার জন্য, গণমানুষের কাতারে দাঁড়ানোর জন্য ভবতোষ চৌধুরী অন্য কোনো পেশায় থিতু হতে পারেননি। তাই নানা সময়ে সম্মুখীন হয়েছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার। তবুও দমে না থেকে বিপুল উদ্দীপনায় গেয়েছেন :

যেমন ধরেন বাঁশের লাঠি একটা ভাঙ্গন যায়
দশটা লাঠি এক হইলে ভাঙা বিষম দায়
ইটের পরে ইট বানাইয়া ঘর দালান কতো বানাই
ঐক্যের মতো বড়ো বল আর নাই ….

শুধু উনার নিজের লেখা গান নয়, বরং সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, গণনাট্য সংঘ অথবা কলকাতাইয়োথ ক্যোয়ারের গান ও উনার কণ্ঠে পেতো অন্য মাত্রা, জাগ্রত করতো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের চেতনা।

ভবতোষ চৌধুরী যখন প্রথমবার যখন উচ্চরক্তচাপ জনিত রোগে শয্যাসায়ী হলেন তখন সিলেট উদীচীর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনির হেলাল, সতীর্থ অনুপ নারায়ণ তাকুলদার এবং আমি গিয়েছিলাম উনার বাসায়। যদিও কথা বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিলো তবুও আজন্ম আড্ডাপ্রিয় ভবতোষ দা অনেক্ষক জমিয়ে গল্প করেছিলেন আমাদের সাথে। এর কিছুদিন বাদেই বাংলাদেশ ছেড়ে পাড়ি জমালাম বিলাতের উদ্দেশ্যে। ওই দেখাই শেষ দেখা হয়ে রইলো।

সময় বয়ে যায় সময়ের নিয়মে। সবাই ছুটছি আপন গতিতে। সময় বসে থাকেনা। বদলায়। কিন্তু কর্ম থাকে মধ্যম সূর্যের মতো জ্বাজল্যমান। আমরা ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক থেকে আত্মকেন্দ্রিকতর হই। আসে পাশের বঞ্চিত শোষিত মানুষের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও হয়তো নেই। কিন্তু তার পরেও একজন ভবতোষ চৌধুরী থাকেন বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা গল্পের নবকুমারের মতো দ্ব্যর্থঃহীন কণ্ঠে বলে তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবোনা কেনো। একজন ভবতোষ চৌধুরীর জাগতিক দেহাবসান হয় ঠিকই তবে অবসান হয়না তাঁর লিগেসি। অবসান হয়না তাঁর ছড়িয়ে যাওয়া মানব মুক্তির মন্ত্র যা। অবসান হয়না শোষিত মানুষের জন্য তাঁর কর্ম গুলো। অবসান হয়না আজীবন ব্যাক্তিগত স্বার্থ এবং লাভের আশা না করে নিঃস্বার্থ ভাবে নির্ভয়ে গাওয়া গণসংগীত গুলো।
ভবতোষ চৌধুরীর মতো আরো অসংখ্য অগ্রজ যারা নানা সময়ে তাঁদের উত্তরসূরিদের অক্লান্ত সাহস যোগিয়েছেন, সেই সাহসের প্রতিফলনই হলো ২০১৩ সালের গণজাগরণ। যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ। ভবতোষ দা হয়তো রাজাকারদের বিচার দেখে যেতে পারেনি, অথবা বোয়ালের গণতন্ত্রে হয়তো আজো পুঁটিদের মুক্তি হয়নি, তবে কাজ করে গেছেন এক প্রত্যয়ী প্রজন্ম বিনির্মানে যারা দেশমাতৃকার জন্য সংকটে সংগ্রামে এক হয়ে আওয়াজ তোলে
আমি বাংলাদেশের বাঙালি
আমারে ডর দেখাইওনা বুলবুলি।দ্ব্যর্থঃ

বিশিষ্ট নাগরিক!! এরা কারা?


পত্রপত্রিকায় প্রায়শঃই দেখি দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা এই বলেছেন, ওই বলেছেন, ইত্যাদি। দেখে মনে সবসময়ই খটকা লাগে। আসলে কারা বিশিষ্ট নাগরিক? বিশিষ্ট নাগরিকের সংজ্ঞা কি ? কি কাজ করলে বিশিষ্ট নাগরিক খেতাব পাওয়া যায়? যাদের নাম আজকাল বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকায় দেখি তাদের বেশিরভাগের অতীত বর্তমান সবার জানা। তাদের পঙ্কিলতা অথবা অর্জন কারো অজানা থাকার কথা নয়। তবুও কার ইঙ্গিতে অথবা কাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য আমাদের গণমাধ্যম ক্রমাগত বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকে প্রকাশ করে বাংলাদেশের কোটি কোটি সৎ, ত্যাগী এবং আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মানের কর্মঠ হাতকে অবশিষ্টদের তালিকায় ফেলে দিচ্ছে।

একটি স্বাধীন দেশে সবার অধিকার সমান হবার কথা। স্ব স্ব ক্ষেত্রে সবার ব্যাক্তিগত কর্মের মাধ্যমেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রে সব ধরণের পেশার মানুষ থাকে এবং এদের ছাড়া একটি দেশ, সমাজ জাতি চলতে পারেনা। একজন মুচি যেমন জুতো সেলাই করে সমাজের অবদান রাখছে তেমনি একজন শ্রমিক শ্রমে ঘামে রচনা করে চলে দিন বদলের পালা। একটি রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। যে কাজটি একজন বিদগ্ধ শিল্পীর মতো বাংলার কৃষকেরা করে চলেছে। হাজারো টানাপোড়েন থাকা স্বত্বেও থামেনি লাঙ্গলের ফলা। বরং মুহুর্মুহু কর্ষণে বাংলা জুড়ে রচনা করছে কৃষি বিপ্লবের গল্পগাঁথা। আমাদের লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের শৈল্পিক হাতে সুচারু বুননে তৈরী হচ্ছে আমাদের অর্থনীতির ভীত। আমাদের দেশের হাজার হাজার গবেষক তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে জয় করছে গোটা বিশ্ব। দেশ জুড়ে আমাদের লক্ষ কোটি শিক্ষক যারা একদম তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা দান করে আগামী বিনির্মাণ করছেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রসার ঘটাচ্ছেন সারা বিশ্বে। এমন লক্ষ কোটি সুনাগরিকের দেশে গুটি কয়েক এলিট মানুষের সিন্ডিকেটকে বিশিষ্ট তকমা দিয়ে বাকিদের কি অপমান করা হচ্ছে না ?

আজকাল যাদের নাম বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকায় দেখি তাদের মধ্যে আছেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আমরা সবাই জানি তিনি গণস্বাস্থ্য’র প্রতিষ্ঠাতা। তবে এটাই কি বিশিষ্ট নাগরিক খেতাব পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ? এবার আসুন দেখে আসি সাম্প্রতিককালে উনার কিছু কর্মকান্ড। বছর তিনেক আগে চলমান যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরুধী কর্মকান্ডের বিচার বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করে উনি শাস্তি পেয়েছিলেন। উনার শাস্তি ছিলো প্রখর রোদে কোর্ট প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে থাকা। উনি পলাতক স্কুল বালকের মতো সঙ্গীসাথী নিয়ে প্রখর রোদে কোর্ট প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। সম্প্রতি সময় টিভির একটি টকশোতে তিনি সেনাবাহিনীর প্রধানকে নিয়ে মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে ধরা খেয়েছেন। যার জন্য প্রকাশ্যে তাকে ক্ষমাও চাইতে হয় এবং সম্ভবত এখনো সেনাবাহিনী কতৃক দায়ের করা মামলা এখনো চলমান। সর্বশেষ উনি টেলিফোনে সমাজবিরুধী কর্মকান্ডের জন্য পরিকল্পনা করেছেন যার অডিও টেপ প্রকাশিত হয়েছে এবং সকল টিভিতে সম্প্রচারিত হয়েছে। যে ফোন কলে উনি উনার ইনস্টিটিউটের মেয়েদের দিয়ে মিথ্যা যৌন হয়রানির মামলা দায়ের করা এবং পঞ্চাশ জন ছাত্রকে দিয়ে মারামারি করিয়ে দেশে অরাজকতার সূত্রপাত ঘটানোর পায়ঁতারা করেছেন।
এতো গেলো ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অতি সাম্প্রতিক কুকর্ম। আমার ধারণা বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকায় প্রথম সারিতে থাকা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিগত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস এবং কর্মকান্ড ঘাঁটলে সুকর্মের পাশাপাশি কুকর্মের পাল্লায় নিশ্চয়ই খুব হালকা হবেনা।

আরেক বিশিষ্ট নাগরিক যিনি বর্তমানে নারী নিগ্রহের মামলায় কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। তার নাম ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। যার নামের পেছনে রয়েছে ইত্তেফাকের এক কর্মীকে হত্যার অভিযোগ, রয়েছে নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে ইত্তেফাক পত্রিকা কুক্ষিগত করার গল্প। আছে নোংরা ভাষায় কথা বলা দাম্ভিক এক চরিত্র। দেশ জাতি গঠনে তার কি আদৌ কোনো ভূমিকা আছে ?

বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকায় থাকা আরেক ব্যাক্তি যার নাম আসিফ নজরুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, টক শো তে দেশদ্রোহী রাজাকারদের বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বিএনপি জামায়াতের পক্ষ্যে গুনকীর্তন করা ছাড়া আসিফ নজরুল কি এমন অর্জন করেছেন যা জাতিকে বিরল সম্মান এনে দিয়েছে? কোন বিশেষ নাগরিক গুণাবলীর জন্য তাঁকে বিশিষ্ট নাগরিকের তকমা দিয়ে সংবাদ প্রচার করছে আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো ?
maxresdefault
তথাকথিত এই বিশিষ্ট নাগরিকের তালিকা অনেক লম্বা। এবং ইনাদের প্রত্যেকের আমলনামা ঘাঁটলে বেরোবে শয়ে শয়ে ঘটনা যা একজন সৎ এবং মহৎ উদ্দেশ্যবান মানুষ কখনোই করতে পারেনা। অথচ এই এলিট শ্রেণীর কতিপয় মানুষদের বিশিষ্ট নাগরিক তকমা দেওয়া হচ্ছে যারা অন্যসব পেশাদার মানুষের মতোই, আলাদা করে রাষ্ট্রের জন্য তাদের কোনো অর্জনই নেই। দেশের বিশেষ সময়ে বিশেষ একটি মহলের স্বার্থ রক্ষার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামা যদি বিশিষ্ট নাগরিক তকমা পাওয়ার প্রধান উপজীব্য হয় তবে আর কোনো কথা নেই। একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণ প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রে বিশিষ্ট নাগরিক বলতে কিছুই থাকা উচিত না। এতে করে বাকি সকল সৎ এবং সুনাগরিককে খাটো করা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশিষ্ট নাগরিক বলে কিছু নাই। তবে সুনাগরিক বলে একটি শব্দ আছে। একটি রাষ্ট্রে যারা নিয়মিত কর দেন, যারা রাষ্ট্রের কোনো আইন ভঙ্গ করেননা এবং কর্মক্ষেত্রে শতভাগ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন তাদেরকে সুনাগরিক বলে গণ্য করা হয় । তথাকথিত এলিট শ্রেণীর গোটাকয়েক পঙ্কিল মানুষদের বিশিষ্ট নাগরিক হিসাবে প্রচার করা কতটা যুক্তিযুক্ত আমার জানা নেই।

তবে শেষ করছি রোমান ইতিহাসের একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে।
রোমান সভ্যতার প্রথম দিকে তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট নাগরিকদের দিয়ে সিনেট গঠিত হতো। সেই সময়ে বিশিষ্ট নাগরিক নির্ণয়ের পদ্বতি ছিলো সফল ব্যবসায়ী, পয়সাওয়ালা এবং সমাজের এলিট ব্যাক্তিবর্গ। জুলিয়াস সিজার ফ্রান্স জয় করার পরে রোমে তাঁর জনপ্রিয়তা হয় গগনচুম্বী। ফ্রান্স জয়ের পরে নিজ দেশে সৈন্য নিয়ে ফেরার আগেই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করতে রোমের তৎকালীন প্রশাসনিক প্রধান পম্পেই ম্যাগনাস মিশরের সাহায্য চাইতে গেলে সেখানে তাকে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রের প্রধানের অনুপস্থিতি এবং ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য রোমে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ এবং অরাজকতা । ফ্রান্স জয় করে বিশ্বসেরা বীর যোদ্ধা জুলিয়াস সিজার রোমে ফিরে নিজেকে দশ বছরের জন্য একনায়কতান্ত্রিক কনস্যোল ঘোষণা করেন। লক্ষ্য একটাই দুর্ভিক্ষ দূরীকরণ, প্রশাসন পুনর্গঠন, বেকার সমস্যা দূরীকরণ সহ গোটা রোম পুনর্গঠন করা। মহাযোদ্ধা জুলিয়াস সিজারের একাগ্র দেশপ্রেম আর জনগনের প্রতি ভালোবাসায় রোম আবার জেগে উঠলো প্রান প্রাচুর্য্যতায়। অতীতে এক যুদ্ধে সিনেটের বিশিষ্ট নাগরিক বয়সে তরুণ ব্রুটাসকে জুলিয়াস সিজার প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। দেশপ্রেম এবং একাগ্রতা দেখে সেই বিশিষ্ট নাগরিক তরুণ ব্রুটাসকে বিশ্বাস করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সেকেন্ড ইন কমান্ড নিয়োগ করলেন। চরম সফল ভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার কয়েক বছর পরে মহাবীর জুলিয়াস সিজার সেই বিশিষ্ট নাগরিক ব্রুটাসের নেতৃত্বে বাকি সব সিনেটর (বিশিষ্ট নাগরিক ) দ্বারা তেইশবার উপর্যুপুরি ছুরিকাঘাতে সিনেট ভবনে নিহত হন।
কারণ ছিলো একটাই, জুলিয়াস সিজারকে হত্যাকরে লোভী সিনেটরদের (বিশিষ্ট নাগরিকদের ) রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ গল্পটি রোমান ইতিহাস থেকে নেওয়া, গল্পের সাথে আমাদের তথাকথিত বিশিষ্ট নাগরিকের চরিত্রের সাথে কোনো মিল নেই। পাঠকরা যদি কোনো মিল পেয়ে থাকেন তবে তা কাকতাল মাত্র।

Blog at WordPress.com.

Up ↑